Anukul Chandra – A “Baba”, His Followers and Us

সেই কাল থেকে পাড়ায় অনুকুলচন্দ্র ঠাকুরকে নিয়ে আদিখ্যেতা চলছে। পুরো আদিখ্যেতার সিস্‌ন তো – দুর্গা পুজো, কালী, লক্ষ্মী, বড়দিন (অবশ্য হয়ত অধিকাংশ হিন্দু বাঙালীদের কাছে মুসলিম কোনো অনুষ্ঠান কেবল একটা ছুটির দিন মাত্র, কাজেই এর মধ্যে মুসলিমদের কিছু থেকে থাকলে সেটাকে “সিস্‌ন” এর প্যাকেজের বাইরেই রাখলাম) – তার ওপর এই অনুকূল বাবা। সত্যি বলতে কি লোকটাকে বা এই “কাল্ট” নিয়ে বিশেষ কিছুই জানতাম না। এতই ঝাঁট জ্বলছে ন্যাকামোগুলো মাইকে বাজাচ্ছে বলে যে খানিকটা বাধ্য হয়েই একটু গুগ্‌ল মারলাম। তো লোকটা ছিল ব্রাহ্মণ এবং কাস্টিস্ট। বর্ণ বিভাজনে এবং “সবর্ণ” বিবাহকেই একমাত্র উচিত পথ বলে প্রচার করতেন। আর নারী সম্পর্কে এই অনুকূল বাবার কি বক্তব্য? “প্রকৃত” ভালো নারী একমাত্র সেই-ই যে নিজের ভেতর মাতৃত্বের গুণগুলোকে যেমন দয়া, মায়া, স্নেহ, ক্ষমা, সতীত্বকে বাঁচিয়ে রাখে, না হলে সে কীসের নারী? নারীদের সম্পর্কে অনুকূলের এইরূপ সব পুরুষতান্ত্রিক “হিতপদেশ” “নারীর নীতি” নামক একটি সংকলনে পাওয়া যায় (অনলাইন ফ্রিতে আছে)।

Facebook page on Anukul Chandra
Facebook page on Anukul Chandra

 অন্যান্য বাবা-টাবাদের মতই যত সব আবল তাবল ব্যাখা দিয়েছেন “বিজ্ঞান” নিয়ে – কসমস থেকে শুরু করে বায়োলজি, সব কিছু নিয়েই। এটা তো ভণ্ড ঢাপ্পাবাজ বাবাদের চিরকালীন প্র্যাকটিস – গুলগাপ্পিগুলো “বিজ্ঞানের” মোড়কে প্রেসেন্ট করা। যাতে “অথেনটিক” শোনায়। প্রশ্ন উঠতে পারে – কেন তাহলে এই সব বাবাদের প্রতি নিবেদিত প্রাণ ভক্তরা নিউটনদের নিয়েই সন্তুষ্ট না থেকে এই বাবাদের কাছে যান। আসলে মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত – সবারই অনেক না পাওয়া, দুঃখ থাকে। কিন্তু প্রাকৃতিক বা সমাজ বিজ্ঞান কখনই মিথ্যা আশ্বাস জোগাবে না। সেই শূন্যস্থানটা পূরণ করতে পারে কেবল ধর্ম বা অলৌকিকতায় বিশ্বাস।আর হ্যাঁ, হয়ত এইসব অনুষ্ঠানে গরীব বড়লোক সকলকেই দেখা যায়, কিন্তু এই সামাজিক আয়োজনগুলোকে অনুভূমিক মনে করার কোনো কারণ নেই। এ যেন সেই হ্যাবারমাসের “(বুর্জুয়া) পাবলিক স্ফিয়ারের” মত – আপাত দৃষ্টিতে দেখে মনে হবে যে সব শ্রেণীর মানুষ একসাথে এসে নিজেদের মধ্যে “সমান্তরালভাবে” আদান প্রদান চালাচ্ছে (এক্ষেত্রে তা ধর্মীয় আকারের)। কিন্তু সামাজিক বিভাজনগুলোকে যাকে ইংলিশে বলে “উয়িস আওয়ে” করে দেওয়া যায় না – সেগুলো তো থেকেই যায়। তাহলে সেগুলো চোখে পরছে না কেন? পড়বে না – কারণ ধর্ম যে আফিম, সেই দাড়িওয়ালা লোকটার কথায় দম আছে। কারণ হায়ারারকিটা খুঁজে পাওয়া যাবে এক স্তর এবস্ট্র্যাকশান (আবার সেই দাড়িওয়ালার ভাষায়, ফেটিস) সনাক্ত করার পর – অনেকটা পেঁয়াজের খোলসগুলোর মতো ব্যাপার। আর তখন দেখা যাবে যে সামাজিক বিভাজনগুলো যে শুধুমাত্র আছে তাই-ই নয়, বরং সেগুলোকে পুনরূত্পাদন করা হচ্ছে। মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্ত তাদের (গ্রামসির) ভাষায় হেজিমনি (অর্থাৎ আদর্শগত দিক থেকে মানসিক এক নিয়ন্ত্রণ আর্থ সামাজিক বিভাজনকে টিকিয়ে রাখার জন্য) সুরক্ষিত করে চলে। একটা সহজ উদাহরণই হল – “বাবার” বাণীতে হয়ত রয়েছে উঁচু নিচু সব সমান (এনারটায় আছে কিনা জানি না, হাইপোথিটিকালি বলছি)। কিন্তু সেই বাণী মঞ্চে উঠে পড়ে শোনাবে কে? যার লেখা পড়া করার সুযোগ হয়েছে। এবং আমরা জানি শিক্ষার ইতিহাসের সাথে আমাদের দেশে বর্ণ ব্যবস্থার কি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। “শুনে” শিখলে হবে না বাপু – নলেজ প্রোডাকশান ও ডিসেমিনেশনের এই ব্রাহ্মণ্যবাদী দিকটা হেজিমনি সুনিশ্চিত রাখার এক জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। মজার ব্যাপার হচ্ছে – রামকৃষ্ণ বা অনুকূল বাবার মত অনেকে বাবাই তাদের বাণী (মূলতঃ) মৌখিকভাবেই দিতেন বা দেন। কিন্তু তাদের ব্যাপারটা আলাদা – সেখানে একটা কম্প্রোমাইজ চলে, কারণ সেখানে মনে করা হচ্ছে যে সেই ব্যক্তি ভগবানের দ্যূত (প্রফেট) গোছের কিছু। কাজেই সেখানে প্রথাগত শিক্ষার যে সামাজিক স্টেটাস, তার থেকেও উঁচু সিঁড়িতে বসে আছেন বাবাজি। কিন্তু সেই বাবাকে নিয়েই যখন পাড়ায় অনুষ্ঠান হবে – তখন আবার হেজিমনির অন্য দিকটা লাগু হয়ে যায় – বাবার বাণী যতই মৌখিক হয়ে থাকুক না কেন, তা তো লিখিত আকারে “শিক্ষিত সমাজে” ছড়িয়ে গেছে। কাজেই “বাবা”কে এপ্রোপ্রিয়েট করার উপায় (এবং কারণ) সেই “শিক্ষিত-অশিক্ষিত” (অতএব উচু-নিচু বর্ণ) বিভাজনই।

বলাই বাহুল্য, এখানে “বাবা” বা তার বাণী সবটাই আরও বৃহত্তর একটা সামাজিক স্পেসকে রিপ্রেজেন্ট করে। যে স্পেসটা অনেকটাই কনসেপচুয়াল স্তরে। অনেকের আশা আকাঙ্খা দুঃখ বেদনা সেখানে ব্যক্তি স্তরকে ছাপিয়ে একটি হেটারোজেনাস “মাস শেয়ারড কনসাসনেস”কে রিপ্রেসেন্ট করে। হেটারোজেনাস এই কারণেই যে সেখানে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে বিভিন্ন সমষ্টির (যা হতে পারে জেন্ডার, শ্রেণী ইত্যাদি) মধ্যেকার তফাতগুলো। কিন্তু সেগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে – হেজিমনি রিপ্রোডিউস্‌ড হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আগে যা ছিল তাই থেকে যাচ্ছে তা নয়। যেমন ধরা যাক, কারুর কারুর মতে এই অনুকূল বাবাদের মতো লোক এবং তাদের এই ফ্যান ফলোইং এটাই প্রমাণ করে যে হিন্দু ধর্ম আসলে খুব “প্লুরালিস্টিক” – সেখানে নানা মত একসাথে বিরাজ করতে পারে। আবার এই দিকটাকেই অনেকে দেখেছেন হিন্দুইজম-এর গিলে ফেলা এবং তার পর হেজিমনি কায়েম করা হিসেবে। অনুকূল বাবার বাণীর কথাই নেওয়া যাক। তিনি যীশু, মহম্মদ-এর মত ইতিহাসের সব প্রফেটদেরই সম্মান করে যেতে বলেছেন (কারণ ঈশব্র এক এবং অভিন্ন, অতএব তার প্রতিক “গুরু”রাও প্রকৃতপক্ষে এক)। অবশ্যই কেউ বলতে পারেন এর মধ্যে “কমিউনাল হারমনি”র বক্তব্য রয়েছে। কিন্তু এবার এও সত্যি যে অনুকূল বাবার বাণীর মধ্যে বিভিন্ন জায়গাতেই হিন্দু ধর্মের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন – বর্ণ ব্যবস্থা বা নারী প্রসঙ্গে তার ধারণা দেখলেই তা বোঝা যায়। আর যখন তাকে নিয়ে অনুষ্ঠান হচ্ছে? সেখানে? আমরা তো দেখলাম মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত আপাতভাবে হলেও এক জায়গায় আসতে পারছে। হতে পারে তা এক “বুর্জুয়া পাবলিক স্ফিয়ার” কিন্তু সেখানেও কি বর্তমান স্টেটাস কুও একেবারেই নাড়া চাড়া পড়ছে না? বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন না হলেও খুব ছোট স্তরে কি কিছু কিছু পরিবর্তন সম্ভব? যেমন ধরা যাক, এটার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে যে, পাড়ার মঞ্চে এসে যে সব মেয়েরা বা মহিলারা বক্তব্য পেশ করছেন, তারা হয়ত এই মঞ্চটা ছাড়া আর কোনোভাবেই পাবলিক স্পেসে এসে নিজের একটা মতামত রাখবার জায়গা পেত না। হতে পারে তাদের বক্তব্যতে অনেক সমস্যা আছে, অবৈজ্ঞানিক, ইল্লজিকাল জিনিস আছে। কিন্তু তাও, কিছু ফেমিনিস্ট, বিশেষত সাবঅলটার্ন স্টাডিজ বা পোস্টমডারনিজম-এর ধারার, হয়ত এটাই বলবেন যে সেই ভুল বলার স্পেসটাও যে তৈরি হয়েছে, সেটাও এক ধাপ এগনো। হয়ত “মাইক্রো” বা খুব ছোট অগ্রগতি বলে আমরা যারা খুব বড় স্বপ্ন দেখতে অভ্যস্ত তারা এই বাস্তবকে অনুধাবন করতে পারি না। আর এক দিক থেকে দেখলে, এখানে যারা জড়ো হচ্ছেন, অনুকূলের অনুষ্ঠানে, তারা হয়ত আর এস এস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সভায় যান না, বা অন্তত কমিউনাল হিংসার রাজনীতির দিকে আকৃষ্ট হবেন না। বিজ্ঞান মনস্কতা আমরা যারা ছড়িয়ে দিতে চাই, তাদের ব্যর্থতাই বলুন বা সমাজের “অবজেক্টিভ কন্ডিশান আর কনশাসনেস”-এর কথাই বলুন, এটা তো সত্যি যে হয়ত অনুকূল বাবাদের এই অনুষ্ঠানগুলো না থাকলে এই মানুষগুলো আর এস এস-এর রাজনীতিতে সাড়া দিত (কজন দিচ্ছে বা দিচ্ছে না তা জানা নেই বটে)।

কিন্তু আমরা মানে যারা সাম্যবাদী এক শান্তিপূর্ণ, বিভেদহীন, যুক্তিবাদী সমাজের স্বপ্ন দেখি আর তাকে গড়ে তোলার চেষ্টা করি, তাদের কি তাহালে করণীয় সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে শো দেখা? একদিকে আর এস এস আর অন্যদিকে অনুকূলরা – মডারেট প্রতিক্রিয়াশীলতা?! এটা তো মানতেই হবে এখন যা চলছে, তার থেকে অন্য কিছু করতেই হবে। তা সে মাত্রা (এক্সটেন্ট), কন্টেন্ট বা ধরণ (ফর্ম) – যেভাবেই হোক, পথ চলায় পরিবর্তন চাই। বিজ্ঞান সংগঠন থেকে শুরু করে বামপন্থী ব্যক্তি বা সংগঠন – সকলকেই ভাবতে হবে কি ভাবে এই “মডারেট আর কট্টর” প্রতিক্রিয়াশীলতার বাইরেও যে একটা বিকল্প হতে পারে, সেই স্বপ্ন মানুষকে দেখানো যায়।

by Kisholoy

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s